Monday, 4 May 2020

একজন মুশফিকুর রহিম মিতুর বেড়ে উঠার গল্প

বাংলাদেশ ক্রিকেট মুসফিকুর রহিম    

মুশফিকুর রহিমের

শুভ জন্মদিন বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান মিস্টার ডিপেন্ডেবল মুশফিকুর রহিম মিতু।

সাল ১৯৮৮, দিনটা ছিলো মে মাসের ৯ তারিখ বগুড়ার মাহবুব হাবিব ও রহিমা খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম হয় এক শিশুর। কে জানতো এই ছেলেটিই একদিন বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেট তারকার একজন হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ বাংলাদেশ ক্রিকেটের এখন পর্যন্ত সব চেয়ে বেশি টেকনিক সম্পন্ন ব্যাটসম্যান মনে করা হয় তাকে,সেটা নির্দ্বিধায় তামিম,মাশরাফিরা স্বীকার করেছে। তামিম তো একবার বলেই ফেলেছিলো আমার ছেলে ক্রিকেটার হতে চাইলে বলবো তুমি মুশফিকের মতো হও।

তিনি বগুড়া জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন।পড়াশোনায় খুবই মেধাবী ছিলেন।বিকেএসপি থেকে এইচএসসি পাশ করেন।তার এইচএসসি রেজাল্ট ছিল ৫.০০। এরপর তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।সেখানে তিনি ইতিহাসে প্রথম বিভাগ পেয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেন।

তার সম্পর্কে একটা তথ্য জেনেছিলাম,তিনি এত বড় ক্রিকেটার হয়েও সহপাঠী দের সাথে ভালো ভাবেই মিশতেন।২ ,১ বার হল এ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো থেকেছেন।জরুরি প্র্যাকটিস না থাকলে ক্যাম্পাসে ব্যক্তিগত কার নিয়ে ঢুকতেন না।অন্য সাধারন শিক্ষার্থীদের মতোই রিক্সায়/পায়ে হেঁটে ক্যাম্পাসে যেতেন।

২০০৬সালে জিম্বাবুয়ে সফরে মুশির ওয়ানডে অভিষেক হয়।ওই বছরের ডিসেম্বরে তার টিটোয়েন্টি অভিষেক হয়।

২০০৭ বিশ্বকাপ দলে খালেদ মাসুদ পাইলটের বদলে তিনি সুযোগ পান তার ব্যাটিং সামর্থ্যের জন্য।ভারতের বিরুদ্ধে করা তার ম্যাচ জেতানো অপরাজিত হাফ সেঞ্চুরি তার সামর্থ্যের প্রমান দিয়েছিল।

২০০৯ সালে মুশি সাকিবের সহঅধিনায়কের দায়িত্ব পান এবং ২০১১ সালে অধিনায়ক এর দায়িত্ব পান। ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ দলের ওয়ানডে অধিনায়ক এর দায়িত্বে ছিলেন।তার অধীনে বাংলাদেশ অনেক সাফল্য পায় এর মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালের এশিয়া কাপের ফাইনালে তোলা।তবে,ফাইনালে হেরে মুশির কান্না সবাইকে নাড়া দিয়েছিল।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মিডল অর্ডার এর নির্ভরতার নাম মুশি।তাই তাকে মি.ডিপেন্ডেবল নামে ডাকা হয়।তিনি অনেক ম্যাচেই অসাধারণ ইনিংস খেলে বাংলাদেশ দল কে রক্ষা করেছেন।বড় টূর্ণামেন্ট এ তার ব্যাট সক্রিয় বেশি থাকে।

দেশের ক্রিকেটে ২ টি নামে পরিচিত এই ছোট শরীরের মানবটি।”মি.ডিপেন্ডেবল ও রান মেশিন”। দলের প্রয়োজনে ব্যাট হাতে রান করেছেন।জিতিয়েছেন অনেক ম্যাচ।প্রশংসাও কুড়িয়েছেন অনেক।

তবে অনেকবার সমালোচনার শিকারও হয়েছেন।কখনো ব্যাটিং নিয়ে,কখনো অধিনায়ক নিয়ে আবার কখনো উইকেটরক্ষক নিয়ে।সমাজের ক্রিকেট প্রেমীরা একটু সুযোগ পেলেই চুল ছেড়া সমালোচনা করেছেন।

নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভার প্রমাণস্বরূপ খ্যাতি যেমন পেয়েছেন ঠিক তেমনি একজন নির্ভরযোগ্য মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবেও দলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত দল থেকে ইনজুরি ছাড়া বাদ পড়েন নি কখনও। লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সর্বোকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে যুক্ত হয়েছে মুশফিকের নাম।

মুশফিকের যখন টেস্টে অভিষেক হয় তখন বি,কে,এস,পিতে তাঁর বন্ধুরা ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্নে বিভোর।অনুর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলা ৩ টেস্ট আর ১৮ একদিনের ম্যাচে যথাক্রমে ৩১ ও ৩৫ গড়ে রান করে আলো ছড়ানো মুশফিকুর রহিম ২০০৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয় দলে ডাক পান। বাংলাদেশ দলের প্রথম ইংল্যান্ড যাত্রা। অপরিচিত কন্ডিশনে আর বাউন্সী ট্র‍্যাকে অনভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে শুধু মুশফিকের জন্য না ,পুরো বাংলাদেশ দলের জন্যই সফরটি ছিলো একটি চ্যালেঞ্জ। তার উপর খালেদ মাসুদ পাইলটের জায়গায় উইকেটরক্ষকের দায়িত্ব পাওয়া ১৬ বছর বয়সী মুশি কতটুকু কি করতে পারবেন ইংল্যান্ডে! মানিয়ে নিতে পারবেন কিনা সেটা নিয়ে সংশয় তো ছিলোই।

কিন্তু সকলের মনের সব সংশয় দূর করে দিয়ে জাতীয় দলের হয়ে প্রস্তুতি ম্যাচে এসেক্স ও নর্দাম্পটনশায়ারের হয়ে খেললেন ৬৩ ও ১১৫ রানের দারুণ দুটি ইনিংস।

সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জায়গা করে নেন সেরা একদাশে। ২৬শে মে ২০০৫, লর্ডসের সবুজ ঘাসে অভিষিক্ত হয়ে রেকর্ড গড়লেন ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার মুশফিকুর রহিম।ঘরে বসে তখন প্রার্থনায় রত বাবা মাহবুব হামিদ আর মা রহিমা খাতুন। মা কথা বলতে পারেন না। কথা জড়িয়ে যায়। কিন্তু ছেলের জন্য আবেগ উৎকন্ঠা সবই যে ফুটে উঠেছিলো তাঁর চোখে।

খেললেন মুশফিক, গর্বিত করলেন তার মা বাবাকে। গর্বিত করলেন বগুড়াবাসীকে। ১৯ রান করে অভিষেকটা তেমন স্মরণীয় করতে না পারলেও ১০৮ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশ দলের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় ব্যাটসম্যান যিনি কিনা দুই অঙ্কের ঘরে পৌছতে পেরেছিলেন। কিন্তু মুশফিকের কি দূর্ভাগ্য, ইনজুরীতে পড়ে পুরো সিরিজের জন্যই চলে গেলেন মাঠের বাইরে। ঘরে বসে মা রহিমা খাতুনের সে কি কান্না! ইনজুরীতে আক্রান্ত মুশফিকের নিষ্পাপ কচি মুখ কুঁকড়ে যেতে দেখেই বোধহয়। মায়ের মন তো।

২০০৬ অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান।আর সুযোগ পেয়েই কোয়াটার ফাইনালে নিয়ে যান দলকে।সেই দলে সাকিব-তামিমও ছিলো।বিশ্বকাপ শেষ হতে না হতেই ডাক পান জাতীয় দলে।

সেই বছরই অর্থাৎ ২০০৬ সালের জিম্বাবুয়ে সফরের দলে। ফরহাদ রেজা আর সাকিব আল হাসানের সাথে তিনিও ছিলেন অভিষেকের অপেক্ষায়।হারারেতে প্রথম অর্ধশতক হাঁকান মুশফিকুর রহিম।

মুশফিকের ব্যাটিং নির্বাচকদের চোখে বিশেষ নজর কেড়েছিলো।তাই খালেদ মাসুদ পাইলট কে সরিয়ে জায়গা করে দেন ২০০৭ বিশ্বকাপে।

আবারও ডাক পান ২০০৭ এর জুলাইয়ের শ্রীলংকার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে। দলে সুযোগ পেয়েই দেখালেন চমক। আশরাফুলের সাথে গড়লেন ষষ্ঠ উইকেটে রেকর্ড ১৯১ রানের জুটি।ব্যাক্তিগত ৮০ রান করে এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের সুবাদে জুটে যায় বোর্ডের সাথে চুক্তিটাও।

বিশ্বকাপের পর ৫ টি ওয়ানডে ম্যাচে করেন মাত্র ৪ রান।তার কারণে দলে জায়গা ছাড়তে হয় ওয়ানডে তে।তার জায়গায় ডাকা হয় ধীমান ঘোষকে।তবে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয় নি।২০০৮ সালে ভারত-শ্রীলংকা-বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং এশিয়া কাপে খেলার জন্য আবারো জাতীয় দলে ওডিআইতে ফিরে আসেন।আর ১ বছর পরেই হয়ে যান সহ অধিনায়ক।জিম্বাবুয়ে সিরিজে মাশরাফির অনুপস্থিতিতে অধিনায়কত্ব পাওয়া সাকিব আল হাসানের ডেপুটির দায়িত্ব বেশ ভালোভাবেই পালন করেন মুশফিক।সেই সিরিজে বাংলাদেশ ৪-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় লাভ করে।সেই সিরিজে ৫৬ গড়ে করেন ১৬৯ রান।সর্বশেষ ম্যাচে করেন ৯৮ রান।

এর পরের গল্পটা পরিশ্রম আর এগিয়ে যাওয়ার গল্প। কীভাবে কঠোর পরিশ্রম একটা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ যেন মুশফিকুর রহিম।করলেন ভারতের বিপক্ষে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে পেলেন জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব।দলকে নিয়ে গেলেন এশিয়া কাপের ফাইনালে,জিতলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ, নিউজিল্যান্ড সিরিজ। টেস্টে ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়াকেও হারানোর ম্যাচে ছিলেন অধিনায়ক।

কোচ সালাহউদ্দিন স্যার মুশফিককে কে নিয়ে করা একটি উক্তি

” বগুড়ার সবচেয়ে নামজাদা আর সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম মুশফিকের। চাইলেই আরাম আয়েশ করে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু বেছে নিলো কঠিন জীবনকে। ওর মত পরিশ্রমী এবং ডেডিকেটেড খেলোয়াড় আমি খুব দেখেছি। হয়ত প্রতিভার দিক দিয়ে অন্য অনেকের থেকেই কিছুটা পিছিয়ে ছিলো কিন্তু সবসময় ছিলো সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। আর ব্যাবহারে ছিলো খুবই নম্র এবং ভদ্র। এখানকার(বি কে এস পি) কারো কাছেই মুশফিক সম্পর্কে খারাপ কিছু শুনবেন না কোনোদিন”

শ্রীলংকার সাথে ২০০৩ বিশ্বকাপে ৫ রানে ৪ উইকেটের সুনামীর দাগ তখনও বেশ টাটকা । টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ৫ বছরে উন্নতির বদলে ক্রমাগত অবনতি হওয়াটা আইসিসির গলায় কাঁটা হয়ে বিধছিল কিছু ক্রিকেটবোদ্ধাদের সমালোচনায় । যেই দল টেস্টে কোনোরকমে ২০০ পার করতে পারলেই খুশি তাদের দিয়ে কি ঘোড়ার আন্ডা টেস্ট হবে ?! এক হাবিবুল কিছু খেলতেন আর আশরাফুল তো আশার ফুল হয়ে ৫-৬ ম্যাচ পর একটা ইনিংস হয়তো খেলতেন , তীর্থের কাকের মত চেয়ে থাকা বাংলাদেশী দর্শকদের হয়তো মাঝেমাঝে ২০০ পার হওয়া ইনিংস কিছুটা হলেও চোখ জুড়াত ।

সেই টালমাটাল ব্যাটিং লাইনআপে অনূর্ধ ১৯ দলে নাম করে আসা ১৬ বছরের এক কিশোরের হঠাৎ করেই অভিষেক , তাও তখনকার ইংল্যান্ডের মত দলের বিপক্ষে তাদের কন্ডিশনে যে দলে ট্রেসকোথিক , ভন , কলিংউড, ফ্লিনটফ , জাইলসরা খেলতেন । খুব বেশি ইমার্জিং কিছু করতে পারেননি । ২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের সাথে টেস্টে প্রথম হাফ সেঞ্চুরি করেন । টেস্ট সেঞ্চুরি প্রথম পান ২০১০ সালে ভারতের বিপক্ষে । প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি পান ২০১১ তে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ।

ক্যারিয়ারের প্রথম এবং বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেন শ্রীলংকার বিপক্ষে ২০১৩ সালে তাদেরই মাটিতে এবং সেটি ছিল ২০০ রানের ইনিংস ।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই পড়েছেন চ্যালেঞ্জের মধ্যে । হারতে প্রচন্ডরকম অপছন্দ করেন যেটা বিভিন্ন সময় তার সতীর্থদের কাছ থেকেই ড্রেসিংরুমের গল্প থেকে শোনা যায় । দলের সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমী ক্রিকেটার , সেটা বিভিন্ন সময় কোচ থেকে শুরু করে সবাই বলেছেন । খুব বেশি ইমোশনাল হিসেবে পরিচিত ,যেটা তার ফেসবুক স্ট্যাটাস , সংবাদ সম্মেলনে অপরিপক্ব কথা থেকেই বুঝা গিয়েছে । সাকিব , তামিম , ম্যাশের মত হিউজ ফ্যান সাপোর্ট তার কখনই ছিল না ।

কিন্তু দলের অপরিহার্য সদস্য হিসেবে প্রমাণ নিজেকে তিনি বরাবরই করে এসেছিলেন । অনেকে তাকে ২০১৬ বিশ্বকাপে সেই ইম্যাচুরড খেলার জন্য মনে রাখে , হার্দিক পান্ডিয়ার মত প্লেয়ার তার বলে ছয় মারার এবিলিটি নেই বলে মুশিকে ব্যঙ্গ করে কিন্ত ওইসব দর্শকের মনে নেই যে মুশি ২০১২ এশিয়া কাপে কি করেছিল , ২০১৪ এশিয়া কাপে ভারতের সাথে কিভাবে একাই দলকে টানার চেষ্টা করেছিল ১১৭ রানের একটি ইনিংস খেলে , পান্ডিয়ার হয়তো মনে নেই কিভাবে ২০১২ সালে তারই এক অগ্রজকে ছক্কা মেরে মুশি ম্যাচটাকে শচীনময় হতে দেয়নি , যেজন্য আজও ভারতীয় শচীন ফ্যানরা হয়তো শচীনের সেই ১০০ তম ১০০ ইনিংসটির হাইলাইটসই শুধু দেখে , ম্যাচের পুরা অংশ দেখে না ।

২০১৫ সালে ইংল্যান্ডের সাথে সবাই রিয়াদের সেঞ্চুরিটিই শুধু দেখে , মুশির ৮৯ রানের ইনিংস নিয়ে কথা বলা লোকের সংখ্যা খুব কম । অধিনায়কত্বের আগে তার টেস্ট গড় ছিল ২৭ কিন্তু অধিনায়কত্বের পরে টেস্ট গড় নিজেকে পাল্টে সেটাকে নিয়ে গেছেন ৪৩ এর ঘরে । পাকিস্তানের সাথে তামিমের সেঞ্চুরি , সৌম্যের অসাধারণ সেঞ্চুরির কথা সবাই বলে , কিন্তু ৬৯ বলে মুশির সেঞ্চুরির কথা কেউ বলে না ।

২০১৭ নিউজিল্যান্ড সিরিজের টেস্টে বাউন্সারে মাথায় আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়ার দৃশ্যটা মনে পড়লে এখনো শরীর কাঁপে। মুশফিকুর রহিম সাচ এ্যা ডেডিকেটেড ম্যান।

২০১৮ সালে প্রশ্ন উঠে তার টিটুয়েন্টি খেলার যোগ্যতা নিয়ে। অবশ্য উঠারই কথা কেনো না মাত্র এক ফিফটি দিয়ে আর জঘন্য এভারেজ স্ট্রাইকরেট দিয়ে আর কতো?? মুখে কিছুই বলেননি মুশফিক বলেছিলেন ব্যাটে। সেবছরের প্রথম টিটুয়েন্টিতেই শ্রীলংকার সাথে ৭২। গল্প এখানেই শেষ নয় ২০০+ রান চেজ করা বাংলাদেশের টিটুয়েন্টিতে ম্যাচ জয়ের নায়ক ছিলো মুশি।

নিজের ছেলের জন্মের ঠিক ৩৫ দিনের মাথায় ৩৫ বলে খেলেছিলেন ৭২ রানের ইনিংস। এখনো চোখে ভাসে সেই নাগিন ডান্সের দৃশ্যটা।

২০১৮ এশিয়া কাপ প্রথম ম্যাচ বাংলাদেশ বনাম শ্রীলংকার ২ রানে ২ উইকেট। ক্রিজে তামিম মুশফিক লাকমলের বাউন্সার ডেলিভারিতে আহত হয়ে মাঠের বাইরে তামিম। এমন গুরুত্ব পূর্ণ ম্যাচ তার উপর তামিম সাকিব ব্যাটিং ডিপার্টমেন্টকে লিড দিতে পারছেনা। মিথুনকে নিয়েই পাড়ি দিলো মুশি।

দলের যখন উইকেট পড়তে থাকে একটা সময় সন্দেহ ছিলো মুশির সেঞ্চুরিটা হবে তো??? সন্দেহ হবারই কথা তিনি সিংগেল রানের চিন্তা করে রুবেল ফিজকেও স্ট্রাইক দিয়েই যাচ্ছিলো।

অবশেষে ফিজকে নিয়েই করলো সেঞ্চুরি ১১২ রানের মাথায় ফিজও আউট এবার কি হবে তামিম তো ব্যান্ডেজ পড়া হাতে হঠাৎ দেখে একহাতে ব্যাট নিয়ে মাঠে আসছে তামিম৷। মুশফিক তারপর কি করছিলো সবারই জানা। ৩২ টা রান করেছিলো একহাতে ব্যাট করতে নামা তামিমকে সাথে নিয়ে।

পাকিস্তানের সাথে ৯৯ রানে আউটের দৃশ্যটা এখনো মনে পড়লে চোখে পানি এসে যায় কত কস্ট করে ইনিংসটা বিল্ড করলো একশো থেকে ১ দূরে কেবল হলো না সেঞ্চুরি তাতে কি ম্যাচ তো জিতলাম।

বর্তমানে খেলা সেরা কিপারদের নাম বললে সবার আগে আমি বলবো মুশফিকের নাম। হ্যা জস বাটলার,মহেন্দ্রো সিং ধোনী, কুইন্টন ডিককদের মনে রেখেই বলছি মুশফিক বর্তমান সময়ের খেলা সেরা উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান সব ফরম্যাটে। আর এটা আবেগের বশে বলছি না বাস্তবতায় বলছি।

তামিম সাকিব মুশফিক এই তিনজনের ব্যাটিং স্টাইলে কাকে সেরা বলবেন আমি তিনজনকেই বলবো সাকিবের সিংগেল স্ট্রাইকরোটেড তামিমের ডাউন দ্যা উইকেট কিংবা মুশির সুইপ শর্ট তিনটাই চোখের শান্তি।

আচ্ছা মুশফিকের সেরা তিনটা ইনিংসের কথা বললে কোন তিনটা ইনিংস সামনে আসবে??

আমার দেখা তিনটা সেরা ইনিংস শ্রীলংকার সাথে ওয়ানডেতে ১৪৪ দক্ষিন আফ্রিকার মাটিতে ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি আরেকটা নিউজিল্যান্ড টেস্টে ১৫৯ রানের ইনিংস। আর টেস্টে দুইটা ডাবল তো রেকর্ড হিসেবেই স্পেশাল।

ফার্স্ট ক্লাসে ১০৭ ম্যাচে ৩৫+ এভারেজে ৬০০৭ রান

লিস্ট এ তে ২৮১ ম্যাচে ৩৮+ এভারেজে ৮৩০৩ রান

৬৬ টেস্টে ১২৩ ইনিংসে ৩৪.৮৩ এভারেজে ১৯ টি ফিফটি ৬ টি সেঞ্চুরি ও ২ টি ডাবল সেঞ্চুরির সাহায্যে ৪০০৬ রান

২০২ ওয়ানডেতে ১৮৮ ইনিংসে ৩৪+ এভারেজে ৩২ ফিফটি ও ৬ টি সেঞ্চুরির সাহায্যে ৫৪২৪ রান।

৭৭ টিটুয়েন্টিতে ৬৯ ইনিংসে ৪ ফিফটির সাহায্যে ১১৩৮ রান।

* টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান

* দেশের হয়ে কিপিংয়ে সবচেয়ে বেশি ডিসমিসাল

*প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে টেস্টে ২ টা ডাবল সেঞ্চুরি

* একমাত্র প্লেয়ার যিনি জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হওয়ার পরেও অর্নুধ ১৯ দলের হয়ে মাঠে নেমেছিলো

*তামিমের পর ২য় বাংলাদেশী হিসেবে টেস্টে চার হাজার রান,ওয়ানডেতে তামিম সাকিবের পর তৃতীয় বাংলাদেশী হিসেবে পাঁচ হাজার রান টিটুয়েন্টিতেও ১ হাজার রান

* একমাএ প্লেয়ার যিনি নিজ দেশের হয়ে সব ফরম্যাটের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসে ম্যাচসেরার পুরস্কার হয়েছেন।

* প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ওয়ানডেতে দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে তাদের মাঠে সেঞ্চুরি।

*প্রথম বাংলাদেশী অধিনায়ক হিসেবে এশিয়া কাপের ফাইনালে পৌঁছেছিলো

* সবচেয়ে কম বয়সে লর্ডসে টেস্ট অভিষেক

* মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের পর ২য় বাংলাদেশী হিসেবে সব ফরম্যাট মিলিয়ে সবচেয়ে বেশিবার অপরাজিত থাকার রেকর্ড

উল্লেখ্য, অফিসিয়াল জন্মদিন হিসেবে মুশির জন্মদিনটা ৯ জুন দেয়া তবে আজক মুশির রিয়েল জন্মদিন।


মোহাম্মদ মুশফিকুর রহিম নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভার প্রমাণস্বরূপ খ্যাতি যেমন পেয়েছেন ঠিক তেমনি একজন নির্ভরযোগ্য মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবেও দলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত দল থেকে ইনজুরি ছাড়া বাদ পড়েননি কখনও। লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সর্বোকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে যুক্ত হয়েছে মুশফিকের নাম।
১৯৮৮ সালের ৯ মে বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন মুশফিকুর রহিম। বাবার নাম মাহবুব হামিদ এবং মায়ের রহিমা খাতুন। স্ত্রীর নাম কিফায়াত মন্ডি।
বিবাহঃ
মুশফিকুর রহিম মানিকগঞ্জের মেয়ে জান্নাতুল কিফায়াত মন্ডি ’ র সাথে ২০১৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। পাত্রী একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর ছাত্রী ছিলেন ।
মন্ডি হলেন জাতীয় দলের আরেক ক্রিকেটার মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের শ্যালিকা।
অভিষেক
অভিষেকের পর থেকেই তিনি জাতীয় দলের উইকেট রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে সেরা উইকেট রক্ষক।
২০০৬ সালের আগস্ট মাসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে মুশফিকুর রহিমের। একই বছরের ২৮ নভেম্বর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি২০তে অভিষেক তার। এর আগে ২০০৫ সালের ২৬শে মে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে অভিষেক ঘটে এই মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যান এর । মাত্র ১৬ বছর ২৬৭ দিনে লর্ডস গ্রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামেন। মিডল অর্ডারে শেষ বছরে বাংলাদেশকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিতিয়েছেন।
উল্লেখ্য , বাংলাদেশ দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ৫৪টি টেস্টে ৩৫.১১ গড়ে ৩২৬৫ রান সংগ্রহ করেছেন মুশফিকুর রহিম । ১৭টি ফিফটির পাশাপাশি ৫টি সেঞ্চুরি করেছেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। ওয়ানডেতে ১৬৮ ম্যাচে ৩০.১৬ গড়ে ৪১২০ রান করেছেন ।
ওয়ানডেতেও তার ব্যাট থেকে ২৭টি ফিফটির পাশাপাশি ৪টি সেঞ্চুরি এসেছে
। টি - টোয়েন্টিতে ৫৯ ম্যাচ শেষে ১টি ফিফটির সাহায্যে ৭২৬ রান করেছেন এই মিডল -

No comments:

Post a Comment